দেশ ও সংবিধান
দেশ ও সংবিধান
আমাদের দেশে কিসের ভিত্তিতে সংবিধান বাতিলের প্রশ্ন উঠছে সেটা বোধগম্য নয়। ১৯৭২-এর সংবিধান ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ও জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা এবং ঐ সময় স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবুর রহমানের মন্ত্রীপরিষদের সদস্যদের গণপরিষদ গঠিত হয়েছিল। সেই গণপরিষদ সংবিধান প্রণয়ন করে। এই গণপরিষদের সদস্যরাই পাকিস্তানের জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচিত প্রতিনিধি ছিলেন। এরপর সরকার প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধন করেছে। কিন্তু, যে চারটি মূলনীতি-সমাজতন্ত্র কি আদৌ বাস্তবায়িত হয়? অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমতা সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষ স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর্যন্ত আদৌ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দেশীয় ৫৫ বছরে ঘটে যাওয়া বাস্তবতার নির্যাস কি তাই বলে? দেশের কত শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে সে প্রশ্নই দেশীয় সংবিধানের ভিত্তি সমাজতন্ত্রের কার্যকারিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। গ্লোবাল ইকোনমির তথ্য অনুযায়ী ২০২২ সালে ১৮.৭% লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। তাহলে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমতা কি সরলরৈখিক?
দেশে দুবার স্বৈরতন্ত্রের পতন হয়েছে ১৯৯০ ও ২০২৪। পঞ্চান্ন বছরে গণতন্ত্র তাহলে ২৪ বছর অস্তমিত ছিল। সংবিধান আওয়ামী লীগ সরকারের সময় পাঁচবার সংশোধন হয়, বিশেষ করে ২০১১ সালে সংশোধনের উল্লেখযোগ্য বিষয়: তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল হয় এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা ঘোষণা করা হয়। ২০২৪ সালে স্বৈরতন্ত্র পতন হয়, কিন্তু বর্তমানে পুরো সংবিধান যদি বাতিল হয়, তাহলে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ইতিহাসও বাতিল হবে। ২০২৪-এর জুলাই বিপ্লব ছাত্র-জনতার স্বৈরতন্ত্রের পতনের পক্ষে এবং কোটামুক্ত মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ ব্যবস্থার এক জলন্ত দলিল, কিন্তু ১৯৭১ সালের বাঙালির আত্মত্যাগ আর জুলাই বিপ্লবের আত্মত্যাগ কি একই মহিমায় মহিমান্বিত হবে?
সময়ের বিবর্তনে
রাষ্ট্রীয়-সামাজিক-অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক-প্রশাসনিক-রাজনৈতিক কাঠামোতে পরিবর্তন এসেছে, সে অনুযায়ী সংবিধান সংশোধন হতেই পারে, কিন্তু পুরো বাতিলের প্রশ্ন কতটা যৌক্তিক? আর যাঁরা দেশীয় রাজনৈতিক সম্মানিত ব্যক্তিগণ সংবিধান বাতিলের কথা বলেছিলেন, হয়তো তাঁরা সেভাবে ভেবে বলেননি। সে কথাকে বারবার হাইলাইট করে পুরোপুরি ১৯৭২-এর সংবিধান বাতিল কি দেশীয় জন্মের ইতিহাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করে না? মানুষ, বস্তু, জড় বা জীব সবকিছুর কি পূর্ণজন্ম হয়? তর্কের খাতিরে হয়তো বলতে হয় ধর্ম বা দর্শন পূর্ণজন্মকে বিশেষ বলা হয়, কিন্তু প্রকৃতিতে ও আইনী প্রক্রিয়ায় জন্ম তো একবারই হয়। তাহলে একটি দেশ তো ধর্ম বা দর্শনের জন্ম প্রক্রিয়ার সূত্রে নয়। তাহলে দেশীয় জন্ম প্রক্রিয়া তো আইন ও সংবিধান অনুযায়ী লিপিবদ্ধ হয়। তাহলে দেশের ঐতিহাসিক ভিত্তি কি, জাতীয়তাবাদের ভিত্তি কি প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে না? দেশের নাগরিক হিসেবে এ দেশকে একটি দেশ হিসেবে কিভাবে সংহত করা হবে সেটাই প্রশ্ন।
©দ্বীন সাঈদীন