প্রতিবাদ

 স্বয়ং বিপ্লবী কবি কাজী নজরুল যদি এই সময়ে এসে সমাজ ও রাষ্ট্রের অসংগতি তাঁর সাহিত্যে তুলে ধরতেন, তবে বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে তা হয়তো হিতের বিপরীত হয়ে দাঁড়াত। তাঁর সময়ের মানুষের সমষ্টিগত চাহিদা ছিল ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসন এবং পরবর্তীতে পাকিস্তানি শাসনের হাত থেকে মুক্তি অর্জন। কিন্তু আজকের সমাজে মানুষের সমষ্টিগত চাহিদা ভিন্ন—তোষামোদ, ব্যক্তিস্বার্থ ও ব্যক্তিগত সুখের পরিধির মধ্যেই যেন তা সীমাবদ্ধ।

ফলে যারা সমাজ ও রাষ্ট্রের অসংগতি নিয়ে ভাবেন, কল্যাণের কথা বলেন, তাদের পরিণতি অনেক সময়ই ভয়াবহ হয়ে ওঠে। একক প্রচেষ্টায় দেশের বা সমাজের মঙ্গল চাইতে গিয়ে তারা সমালোচনা ও শাস্তির মুখোমুখি হন। ই.উ.বি.-এর অধ্যাপক ড. সরোয়ার হোসেন ট্রান্সজেন্ডার ইস্যুতে বিনম্র ভাষায় মত প্রকাশ করায় প্রথমে বহিষ্কৃত হন, পরে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের মুখে পুনর্বহাল করা হয়। তিনি একটি বিতর্কিত সামাজিক ইস্যু নিয়ে কথা বলে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করেছিলেন—কিন্তু সেই চেষ্টাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে দাঁড়ায়।

বর্তমান সমাজে বিভিন্ন সংগঠন ও গোষ্ঠী যখন একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গিকে সমর্থন করে, তখন তার বিপরীত অবস্থান নেওয়া ব্যক্তির পক্ষে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ সমাজের প্রচলিত চেতনার পরিপন্থী যে কোনো উদ্যোগ সহজেই নেতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হয়। এই বাস্তবতায় নজরুলের প্রতিবাদের পরিণতিও হয়তো ভিন্ন হতো না।

প্রতিবাদকে সবসময় ইতিবাচকতার মানদণ্ডে বিচার করা হয় না; কিন্তু প্রতিবাদের পরবর্তী ইতিবাচক পরিবর্তনের সুফল সমাজ ঠিকই ভোগ করে। একজন প্রকৃত প্রতিবাদীকে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির বহুস্তর অতিক্রম করতে হয়—যেমনটি করেছিলেন কাজী নজরুল, তাঁর লেখনীর মাধ্যমে ঘুমন্ত বিবেককে জাগ্রত করে।

সময় বদলেছে, বদলেছে সমাজ ও রাষ্ট্রের কাঠামো। নতুন সামাজিক উপাদানের সংমিশ্রণে মানুষের চিন্তা, চেতনা, নৈতিকতা ও বিচারবোধেও এসেছে আমূল পরিবর্তন। এই বাস্তবতা বিবেচনায় না রাখলে প্রতিবাদের পথ কখনো কখনো জীবনকে জ্বলন্ত লাভার মতো কঠিন করে তুলতে পারে।

Popular posts from this blog

Mental Sickness

E-learning

Imperialism VS Terrorism

At Sixes And Sevens

Bilateral Coherence and Dissonance Relationship between Western and Bangladeshi Culture

Mentalism:07

Shrewdness

Oppression upon Women Folks