বৈশ্বিক ভূরাজনীতির মৌচাক ও আমাদের আত্মঘাতী বিভাজন
বৈশ্বিক ভূরাজনীতির মৌচাক ও আমাদের আত্মঘাতী বিভাজন
মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা মহাদেশ একেকটা মৌমাছির চাক। মৌমাছির চাকে আকর্ষণ থাকবেই। ভাবতে পারেন কতটা ভিখারি ছিল ইউরোপ। মধ্যযুগ থেকে ছলনা, কৌশল, আধিপত্য খাটিয়ে ভিক্ষারীর বাচ্চারা লুট করেছে দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার প্রাকৃতিক সম্পদগুলো; শোষণ করেছে আমাদের—কারণ আমাদের মাঝে ঐক্য ও স্বকীয়তার বড় অভাব। আমরা অনুকরণপ্রিয়। ওরা ঐক্য ও স্বকীয়তা, জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ। এখানেই আমাদের পার্থক্য। আপনি যদি কোনো মানুষকে সুযোগ না দেন, কারো বাবার সাধ্য নেই আপনার কাছ থেকে একবিন্দু সুবিধাভোগ করার।
মনে পড়ে, পলাশীর যুদ্ধে কিভাবে নবাব সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে খালা ঘষেটি বেগম ও মীরজাফর ইংরেজদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে স্বাধীনতার সূর্য দুশো বছর অস্তমিত করেছিল। কথায় আছে, ঘরের শত্রু বিভীষণ। এশিয়া ও আফ্রিকার মানুষদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধতা, স্বকীয়তা ও স্বাজাত্যবোধের খুব অভাব, যার কারণে পশ্চিমারা শোষণের সুযোগ পায়।
পশ্চিমারা এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশ থেকে সম্পদ চুরি করে, দখল করে, আধিপত্য বিস্তার করে, কৌশলগত ভূরাজনীতি করে সম্পদের পাহাড় গড়েছে—এখন নতুন উপায়ে করছে। বিশ্ব অর্থনীতি, মিডিয়া, গণমাধ্যম, আন্তর্জাতিক সংস্থা, বিশ্ব বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও অস্ত্র কোম্পানি—সবই পশ্চিমাদের নিয়ন্ত্রণে; ওদের ইশারায় সব চলে। যেমন, ট্রাম্প ইরান–ইসরায়েল যুদ্ধ নিয়ে যে নাটকীয়তা করছে, আবার নোবেল শান্তি পুরস্কারে মনোনীত হওয়ার অপেক্ষায় আছে—সবই ওদের বৈশ্বিক কাঠামোভিত্তিক একটি ভূ-রাজনৈতিক, কৌশলগত নাটকের মহা প্ল্যাটফর্ম; আর আমরা বিশ্ববাসী তার নিষ্ক্রিয় দর্শক।
কাতার, সৌদি আরব, কুয়েত, ওমান, জর্ডান—এরা মধ্যস্থতা নামক নাটকের মঞ্চ সাজিয়ে বসে আছে। পুরো বৈশ্বিক কাঠামো পশ্চিমারা এমনভাবে ডিজাইন করেছে যাতে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা নামক মৌচাকের মধু তারা আস্বাদন করবে, আর আরব লীগ মধ্যস্থতার নাটকের মঞ্চ সাজাবে। পুরো নাটক বিশ্ববাসী মিডিয়ার মাধ্যমে দেখবে, আর আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো মানবাধিকার লঙ্ঘনের নাটক মঞ্চস্থ করতে পশ্চিমাদের পাঁচটা—জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আদালত—অগ্রণী ভূমিকা পালনে ব্যস্ত থাকবে। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক নাটক করবে ডলার দরপতনের, বিশ্ব অর্থনৈতিক মঞ্চে নতুন নাটক মঞ্চস্থ হবে। আর বোকা আরব লীগ পশ্চিমাদের পা চেঁটে অসহায়দের আর্তনাদকে ভারী করে তুলবে।
আমেরিকা এত “ইসরায়েল, ইসরায়েল” করে কেন? পেছনে জায়োনিস্ট কমিউনিটি, যারা আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে টাকা ঢালে, যাতে প্রার্থীরা ইসরায়েলের পক্ষে থাকে। AIPAC রাজনৈতিক প্রার্থীদের পেছনে টাকা বিনিয়োগ করে, যাতে মুনাফা হিসেবে আমেরিকা ইসরায়েলের পক্ষ নেয়। তাই তো জো বাইডেন থেকে শুরু করে ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বিচারে গাজায় জেনোসাইডে সমর্থন জানায়।
যখনই কোনো উদীয়মান দেশ পারমাণবিক শক্তিতে শক্তিধর হতে থাকে, তখনই আমেরিকা নানা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করে—যেমন ইরান। আমেরিকা চায় না ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে এগিয়ে পারমাণবিক বোমা বানানোর পথে অগ্রসর হোক; যার ফলে আমেরিকার মদদে ইসরায়েল ইরানে হামলা চালায়, পাল্টা হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
আমেরিকা যা ইচ্ছে তাই করতে পারে, কিন্তু রাশিয়া, চীন, উত্তর কোরিয়া পারবে না—যদিও সামরিক শক্তিতে রাশিয়া প্রথম। এই ট্রাই-পোলার শক্তিশালীরা ইউনিপোলার আমেরিকার সঙ্গে পারবে না, কারণ ইইউর ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর সম্মিলিত শক্তির কাছে হেরে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, আইআরজিসি, ইউএন—সবই আমেরিকার অধিভুক্ত; এমনকি মিডিয়ার নিয়ন্ত্রণও।
আরব লীগ ব্যস্ত আমেরিকার পা চাঁটায়। ইরান ও ভেনেজুয়েলার মতো দক্ষিণ আমেরিকার ছোট দেশগুলো আমেরিকাকে চোখ রাঙায়, কিন্তু আরব লীগ নিজেদের আর্থ-রাজনৈতিক সুবিধার্থে নিজেদের দেশে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের সুযোগ দিয়ে আমেরিকার হেজেমনিক পাওয়ারকে আরও সুসংহত করে। গাজা, সিরিয়া, ইয়েমেন, লিবিয়ার মানুষদের দীর্ঘশ্বাস ভারী করার সুযোগ দিয়ে পশ্চিমা সংস্কৃতি আরবীয় সংস্কৃতিতে এনে কুরআনের বাণীগুলোকে সত্যে রূপ দিচ্ছে।
সৌদিতে একটা সময় বার ও ড্রিংকস সংস্কৃতি নিষিদ্ধ ছিল; এখন ওরাই তা অনুসরণ করছে। নিজেদের স্বকীয় সংস্কৃতি, স্বকীয়তা ও স্বতন্ত্রতা ভুলে আমেরিকার পা চাঁটাই যাদের লক্ষ্য, তাদের থেকে ইমাম গাজ্জালী, আল-বিরুনি, জাবির ইবনে হাইয়ান, ইবনে সিনা প্রমুখ ব্যক্তিত্ব আসবে না। জাবির ইবনে হাইয়ান ও ইবনে সিনার বই ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নাম বিকৃত করে পড়ানো হয়। পশ্চিমারা আত্মসাৎকারী, ভিখারি—অথচ আরব লীগ তা ভুলে গিয়ে ওদেরই প্রভু মানে। ©