উচ্চশিক্ষার পথে মানসিক অবক্ষয়"
"উচ্চশিক্ষার পথে মানসিক অবক্ষয়"
বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিদিন অসংখ্য ছেলে-মেয়ে নতুন স্বপ্ন নিয়ে পা রাখে, কিন্তু তাদের অনেকের মানসিক পরিপক্বতা থাকে শূন্যের কাছাকাছি। কেউ মেধাবী হলে তাকে ঘিরে জন্ম নেয় ঈর্ষা; কেউ একটু মোটা বা কালো হলে শুরু হয় নির্মম বুলিং; আর যে ছাত্রটি দুর্বল, তাকে তথাকথিত "ভালো ছাত্র" পরিচয়ের বাহকরা নিজেদের গণ্ডির বাইরে ঠেলে দেয়। এত ক্ষুদ্র মানসিকতা নিয়েই তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজায় প্রবেশ করে যা হওয়া উচিত মুক্ত চিন্তা ও মানবিকতার সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র।
হিংসা কখনো মেধাবী ছাত্রকে বাধ্য করে ক্রেডিট ট্রান্সফারের পথে হাঁটতে; বডি-শ্যামিংয়ের অপমান সইতে না পেরে কেউ আত্মহত্যার মতো ভয়ানক সিদ্ধান্ত নেয়; আর দুর্বল ছাত্রটি নিজেকেই দুর্বল হিসেবে বিশ্বাস করতে শুরু করে। এভাবে বিশ্ববিদ্যালয় নামের শিক্ষা-প্রাঙ্গণই হয়ে ওঠে অসহিষ্ণুতা, প্রতিযোগিতার বিষ, এবং মানসিক নির্যাতনের ক্ষেত্র।
"সংকীর্ণ মানসিকতার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব"
বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সংকীর্ণ মানসিকতা শুধু ক্যাম্পাসেই সীমাবদ্ধ থাকে না, কর্মজীবনেও এর গভীর প্রভাব পড়ে। ভালো ছাত্রের দায়িত্ব অনেক, কিন্তু তারা নিজেদের গণ্ডিকে এতটুকু ছোট করে ফেলে যে দুর্বলদের প্রতি কোনো মানবিকতা বা বন্ধুত্বের হাত বাড়ানো তাদের অভ্যাসে থাকে না। তারা ভাবে যদি তাদের নোট বা পড়ার কৌশল কেউ পেয়ে যায়, তবে সে এগিয়ে যাবে। অথচ মেধাবী হওয়ার মানদণ্ড কেবল একাডেমিক পারফরম্যান্স নয় বরং সহযোগিতা, সংবেদনশীলতা, নেতৃত্ব, এবং অন্যকে অনুপ্রাণিত করার শক্তিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
যে ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করে সকলকে সমভাবে গ্রহণ করার মানসিকতা গড়ে তুলতে পারে না, তার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় নয় বরং কিন্ডারগার্টেনের গণ্ডিই যথাযথ। আর যে মেধাবী তাকে হিংসে করা নয়, বরং নিজেকে উন্নত করা এই হওয়া উচিত প্রকৃত উচ্চশিক্ষার চেতনা।
"আত্মহত্যা, চাপ ও মানসিক স্বাস্থ্য"
প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয়ে একাডেমিক চাপ, পারিবারিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা সব মিলিয়ে বহু শিক্ষার্থী আত্মহত্যার দিকে ধাবিত হয়। ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রের আত্মহত্যা, ইউল্যাবের ছাত্রীর সাম্প্রতিক মর্মান্তিক মৃত্যু এই ঘটনাগুলো বারবার মনে করিয়ে দেয় কতো গভীরভাবে সংকীর্ণ মানসিকতা, প্রতিযোগিতার চাপ এবং মানসিক অসহায়ত্ব আমাদের শিক্ষাঙ্গনকে গ্রাস করছে।
যদিও কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে কাউন্সেলিং সেন্টার রয়েছে, তবে তার সংখ্যা ও কার্যকারিতা অত্যন্ত সীমিত। একটি জীবনের অকাল ঝরে যাওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয় একজন সন্তানের বড় হয়ে ওঠার পেছনে বাবা-মায়ের পরিশ্রম, আশা, অপার স্বপ্ন জড়িয়ে থাকে।
আর যেসব শিক্ষার্থী আত্মহত্যা বেছে নেয়, তাদের মধ্যে মানসিক শক্তির ঘাটতি থাকে কারণ প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নিজেকে টিকিয়ে রাখা, সামলে নেওয়া, এবং পুনরায় দাঁড়িয়ে যাওয়ার ক্ষমতাই একজন মানুষের প্রকৃত শক্তি। সফলতার মাপকাঠি শুধু ডিগ্রি বা চাকরির পজিশন নয় বরং জীবনযুদ্ধের প্রতিটি মুহূর্তে নিজেকে ধরে রাখার ক্ষমতাই মানুষের আসল অর্জন।
©