সোশ্যাল মিডিয়া ও ইন্সটেন্ট জাজমেন্ট
সোশ্যাল মিডিয়া ও ইন্সটেন্ট জাজমেন্ট
আমি গত পাঁচ বছর ধরে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করছি। এই ভার্চুয়াল জগতে মানুষের মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে অনেক কিছু শিখেছি। লক্ষ্য করেছি, অনেকেই আছেন যারা কারো ফার্স্ট ইমপ্রেশন দেখে মুগ্ধ হয়ে তাকে ফলো করেন; আবার হঠাৎ একদিন আনফলো বা ব্লক করে দেন। এই তড়িৎ মানসিকতাই আমাদেরকে বারবার ভুল পথে নিয়ে যায়।
একজন মানুষকে শুধু প্রথম দেখায় মূল্যায়ন করবেন না। আগে তার ব্যক্তিত্ব, দৃষ্টিভঙ্গি, এবং মানসিকতা আপনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা বোঝার চেষ্টা করুন। ইন্সটেন্ট জাজমেন্ট তা যতই ক্ষণিকের হোক না কেন প্রায়শই দীর্ঘস্থায়ী ভুলের জন্ম দেয়। এবং যদি আপনি কাউকে অপছন্দও করেন, তাহলেও তাকে অসম্মান করা কখনোই শোভন নয়। মানুষকে বুঝতে সময় দিন, ধৈর্য ধরুন।
সাহিত্যে এর প্রতিচ্ছবি বারবার এসেছে।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিলাসী গল্পে ন্যাড়া চরিত্রের এক সদ্য বিধবা আত্মীয়া, স্বামীর লাশের পাশে একা থাকতে ভয় পেয়ে বলে ওঠে, "ওরে বাপরে! আমি একলা থাকতে পারব না!"— এই বাক্যটিতে শুধু তার ভয় নয়, বরং তার ভেতরের দ্বিচারিতা ও মানসিক দুর্বলতার ব্যঙ্গচিত্র অঙ্কিত হয়েছে। যদি তার স্বামী জীবিত থাকতেন, তিনি হয়তো স্ত্রীর এই আচরণ দেখে হতবাক হতেন।
জেন অস্টেনের Pride and Prejudice-এ এলিজাবেথ বেনেট মি. ডার্সিকে বারবার ভুল বুঝেছেন, ফার্স্ট ইমপ্রেশনে তাকে অহংকারী ভেবেছিলেন। কিন্তু ধীরে ধীরে যখন সত্য উন্মোচিত হলো, তখন তিনি বুঝলেন ডার্সি আসলে ছিলেন একজন হৃদয়বান ও মার্জিত মানুষ।
আমরা সবাই ভুল করতে পারি। কিন্তু কারো ওপর চটজলদি রায় দিয়ে ফেলা, তাকে হিরো থেকে জিরো বানিয়ে দেওয়া এটি এক ভয়ংকর অন্যায়।
মানুষ পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল জীব। যদি মানুষকে বোঝা এত সহজ হতো, তাহলে সাহিত্যে সম্পর্কের জটিলতা উঠে আসত না, কিংবা মনোবিজ্ঞানের এত গবেষণাও প্রয়োজন হতো না।
ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকেও এ বিষয়ে সুস্পষ্ট বার্তা রয়েছে। হাদিসে এসেছে
"মন্দ ধারণা পোষণ করা থেকে তোমরা দূরে থাকো। কেননা, মন্দ ধারণা হলো সবচেয়ে বড় মিথ্যা কথা।"
(তিরমিজি, হাদিস: ১৯৮৮)
সুতরাং, কারো সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সময় নিন। যাচাই করুন, বোঝার চেষ্টা করুন। পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজ কাউকে সত্যিকার অর্থে বোঝা। আর সবচেয়ে নিন্দনীয় কাজ বোঝার চেষ্টা না করে তাকে বিচার করা।
©