ইসলাম
মা, স্ত্রী ও সন্তানের দায়িত্ব: সাফল্য, মানবিকতা ও ন্যায়ের ভারসাম্য
একজন মা মৃত্যুবরণ করলেন, আর তাঁর সন্তান সমাজে প্রতিষ্ঠিত। এই তথ্য দিয়ে প্রমাণ হয় না যে তিনি একজন সফল মা ছিলেন। সন্তান বড় কর্মকর্তা, ধনী বা প্রভাবশালী হলেই মা-বাবার জীবনের সার্থকতা নির্ধারিত হয় না। প্রকৃত সাফল্য তখনই প্রতিফলিত হয়, যখন সন্তান মানবিকতা, দায়িত্ববোধ, কৃতজ্ঞতা ও নৈতিকতার পরিচয় দেয় এবং মা-বাবার শেষ সময় পর্যন্ত তাদের পাশে থাকে।
আমাদের সমাজে অনেক সময় সন্তানের সামাজিক অবস্থান, পদমর্যাদা বা অর্থনৈতিক সাফল্যকে কেন্দ্র করেই একজন মাকে রত্নগর্ভা বলা হয়। কিন্তু এই প্রচলিত ধারণাকে নতুন করে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। একজন সন্তানের প্রকৃত মূল্যায়ন হওয়া উচিত তার চরিত্র, মানবিকতা, নৈতিকতা এবং পারিবারিক দায়িত্ব পালনের ভিত্তিতে।
মা-বাবার দায়িত্ব শুধু সন্তানকে ভালোবাসা নয়; তাকে দায়িত্ববোধ, কৃতজ্ঞতা, ন্যায়পরায়ণতা ও মানবিকতার শিক্ষাও দেওয়া। একই সঙ্গে বার্ধক্যে সম্পূর্ণভাবে সন্তানের ওপর নির্ভরশীল না হওয়ার জন্য যথাসম্ভব আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করাও গুরুত্বপূর্ণ।
বাস্তবতায় দেখা যায়, বিয়ের পর অনেক ছেলে-মেয়ে তাদের নতুন সংসারকে কেন্দ্র করে এমনভাবে জীবন গড়ে তোলে যে মা-বাবা, দাদা-দাদী বা নানা-নানীর অবদান ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যায়। অথচ একজন মানুষের জীবনে জীবনসঙ্গী যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি মা-বাবার প্রতিও তার দায়িত্ব রয়েছে। পরিণত ও সুস্থ মানসিকতার পরিচয় হলো, এই সম্পর্কগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা।
একজন স্ত্রীকে মনে রাখতে হবে, তাঁর স্বামী যেমন তাঁর জীবনসঙ্গী, তেমনি তিনি কারো সন্তান এবং কারো ভাই। একইভাবে একজন স্বামীরও উচিত স্ত্রীকে ভালোবাসা, সম্মান ও নিরাপত্তা দেওয়ার পাশাপাশি মা-বাবার ন্যায্য অধিকার, মর্যাদা ও প্রয়োজনের প্রতিও দায়িত্বশীল থাকা। কোনো একটি সম্পর্কের প্রতি অতিরিক্ত পক্ষপাত দেখিয়ে অন্য সম্পর্কের অধিকার ক্ষুণ্ণ করা পরিণত মানসিকতার পরিচয় নয়।
মানুষ একদিন নিজেও মা-বাবা, দাদা-দাদী কিংবা নানা-নানী হবে। তাই নিজের মা-বাবার সঙ্গে আচরণ করার সময় মনে রাখা প্রয়োজন যে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অনেক সময় পূর্ববর্তী প্রজন্মের আচরণ থেকেই শিক্ষা গ্রহণ করে।
সবশেষে, যদি কোনো সন্তানের মধ্যে মা-বাবার প্রতি দায়িত্ববোধ, কৃতজ্ঞতা ও মানবিকতা না থাকে, তাহলে তার সামাজিক সাফল্য যত বড়ই হোক না কেন, সন্তান হিসেবে তার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
মা ও স্ত্রী: প্রতিযোগিতা নয়, দায়িত্বের ভারসাম্য
সমাজে প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে, "মা বড় না বউ বড়?" এমন প্রশ্ন এবং কিছু সাংস্কৃতিক উপস্থাপন অনেক সময় একটি ভুল দ্বন্দ্ব তৈরি করে। বাস্তবে মা ও স্ত্রী একে অপরের প্রতিপক্ষ নন; বরং তারা একজন মানুষের জীবনের দুটি ভিন্ন কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের সম্পর্ক।
একজন পুরুষের কর্তব্য হলো উভয়ের প্রতি সম্মান, ভালোবাসা ও ন্যায়ের ভিত্তিতে দায়িত্ব পালন করা। কারণ ইসলাম কোনো সম্পর্ককে অন্য সম্পর্কের বিরুদ্ধে দাঁড় করায় না; বরং প্রত্যেকের প্রাপ্য অধিকার যথাযথভাবে আদায়ের নির্দেশ দেয়।
মহান আল্লাহ বলেন,
"আমি মানুষকে তার পিতামাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্টের উপর কষ্ট সহ্য করে গর্ভে ধারণ করেছে... (আমি নির্দেশ দিয়েছি) আমার প্রতি এবং তোমার পিতামাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। আমারই দিকে প্রত্যাবর্তন।"(সূরা লুকমান, ৩১:১৪)
এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার ও কৃতজ্ঞতা আল্লাহর নির্দেশ এবং প্রত্যেক মানুষকেই শেষ পর্যন্ত তাঁর কাছেই প্রত্যাবর্তন করতে হবে।
আবার আল্লাহ বলেন,
"তোমরা নারীদের সাথে সদ্ভাবে জীবন যাপন করো।" (সূরা আন-নিসা, ৪:১৯)
এই আয়াত স্ত্রীর প্রতি সম্মান, ন্যায়পরায়ণতা ও দায়িত্ব পালনের গুরুত্ব তুলে ধরে।
আরও বলা হয়েছে,
"আল্লাহর ইবাদত করো এবং পিতামাতা, আত্মীয়স্বজন, এতিম, অভাবগ্রস্ত, প্রতিবেশী, সঙ্গী ও মুসাফিরদের সাথে সদাচরণ করো।" (সূরা আন-নিসা, ৪:৩৬)
এই নির্দেশনা থেকে স্পষ্ট হয় যে একজন মুমিনের জীবন শুধু ইবাদতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং সৃষ্টির প্রতি দায়িত্বশীল আচরণও তার ঈমান ও নৈতিকতার অংশ।
ইসলামের দৃষ্টিতে একজন মানুষের চূড়ান্ত জবাবদিহিতা তার স্রষ্টার কাছে। মা, স্ত্রী কিংবা অন্য কোনো সম্পর্ক পরকালে তার আমলের দায়ভার বহন করবে না; প্রত্যেকেই নিজ নিজ কর্মের জন্য জবাবদিহি করবে। তাই মা ও স্ত্রীর সম্পর্ককে প্রতিযোগিতা হিসেবে নয়, বরং দায়িত্ব, ন্যায় এবং ভারসাম্যের একটি নৈতিক কাঠামো হিসেবে দেখা উচিত।
একজন মানুষ যত বেশি ভালোবাসা, ন্যায়, কৃতজ্ঞতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে এই সম্পর্কগুলো পালন করবে, তার জীবন তত বেশি সুশৃঙ্খল, অর্থবহ ও মর্যাদাপূর্ণ হবে। কারণ একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় কেবল তার সামাজিক অবস্থানে নয়; বরং সে তার ওপর অর্পিত দায়িত্বগুলো কতটা ন্যায় ও মানবিকতার সঙ্গে পালন করেছে, তার মধ্যেই নিহিত।
©দ্বীন সাঈদীন