" ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার কারণ: মনোবিজ্ঞান, স্নায়ুবিজ্ঞান, ইসলাম"
" ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার কারণ: মনোবিজ্ঞান, স্নায়ুবিজ্ঞান, ইসলাম"
ছোট ছোট মেয়েদের রেপ করা হচ্ছে। বাচ্চারা তো কোনো দোকানের ফল নয় যে যেভাবে খুশি ব্যবহার করবে। ধর্ষণ কেন হয়? নারীর পোশাক এই ধরনের ব্যাখ্যা বৈজ্ঞানিক বা অপরাধবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ধর্ষণের প্রধান কারণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে পোশাক বা যৌন আবেদন কোনোভাবেই কারণ হিসেবে দাঁড়ায় না, কারণ শিশুদের মধ্যে যৌন উদ্দেশ্যপূর্ণ আচরণ থাকে না। ধর্ষণের মূল কারণ সাধারণত ক্ষমতার অপব্যবহার, নিয়ন্ত্রণের মানসিকতা, অপরাধপ্রবণতা এবং সামাজিক-নৈতিক ব্যর্থতার সাথে সম্পর্কিত।
আমাদের মা-বোনদের কেন নিরাপত্তা দিতে আমরা ব্যর্থ? অনেক সময় দেখা যায়, বোরকা পরিহিত বা সম্পূর্ণ আবৃত নারীরাও নির্যাতনের শিকার হন যা স্পষ্ট করে যে পোশাক এখানে নির্ধারক কারণ নয়।
যৌনতা ও আচরণের ক্ষেত্রে সিগমন্ড ফ্রয়েড এর ইদ , ইগো ও সুপারইগো ধারণা মনোবিজ্ঞানের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হলেও আধুনিক মনোবিজ্ঞান একে ধর্ষণের সরাসরি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হিসেবে গ্রহণ করে না। এটি একটি তাত্ত্বিক কাঠামো, কিন্তু অপরাধের কারণ ব্যাখ্যায় এটি একক বা সিদ্ধান্তমূলক নয়। ধর্ষণকে সাধারণত জৈবিক নয়, বরং সামাজিক, আচরণগত ও ব্যক্তিত্বজনিত জটিল কারণের সমন্বয়ে ব্যাখ্যা করা হয়।
নিউরোসায়েন্সের দৃষ্টিতে যৌনতা, আবেগ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা, রিওয়ার্ড সিস্টেম এবং প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স ভূমিকা রাখে। তবে এটি বলা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয় যে শুধু কোনো একটি অংশ দুর্বল হয়ে গেলেই ধর্ষণ ঘটে। বরং অপরাধমূলক আচরণ বহুস্তরীয় কারণের ফল যার মধ্যে থাকে নিয়ন্ত্রণহীন আগ্রাসন, ব্যক্তিত্বগত বিকৃতি, সামাজিক পরিবেশ ও শিখিত আচরণ।
এন্ডোক্রাইনোলজির ক্ষেত্রে টেস্টোস্টেরনের মতো হরমোনের সাথে আগ্রাসন বা যৌন প্রবণতার কিছু সম্পর্ক পাওয়া যায়, তবে গবেষণায় এটি সরাসরি ধর্ষণের কারণ হিসেবে প্রমাণিত নয়। হরমোন কেবল আচরণের প্রবণতাকে প্রভাবিত করতে পারে, কিন্তু নৈতিক সিদ্ধান্ত বা অপরাধ সংঘটনের চূড়ান্ত কারণ নয়।
ইসলামিক থিওলজিতে বলা হয়েছে:
"ওহে বিশ্বাসীরা! তোমরা তোমাদের দৃষ্টি নিচু কর এবং তোমাদের লজ্জাস্থান রক্ষা কর; এটি তোমাদের জন্য অধিকতর পবিত্র ও উত্তম।"– সূরা নূর ২৪:৩০
এই আয়াত নৈতিকতা, আত্মসংযম ও দৃষ্টির শুদ্ধতার ওপর গুরুত্ব দেয়। ইসলাম সামগ্রিকভাবে যৌন অপরাধ ও অবৈধ আচরণকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে।
তাহলে কেন এই ফুলের মতো নিষ্পাপ শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে?
মূলত এখানে ভেসে ওঠে পাওয়ার স্ট্রাকচার, নিয়ন্ত্রণের মানসিকতা এবং অপরাধীর নৈতিক ব্যর্থতা। নারী বা শিশুদের দুর্বল হিসেবে দেখার সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও এই সহিংসতাকে বাড়াতে পারে। তবে বাস্তবতা হলো শারীরিক দুর্বলতা নয়, বরং অপরাধীর নিয়ন্ত্রণহীন আচরণ ও ক্ষমতার অপব্যবহারই মূল কারণ।
ছোট শিশুটি নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম ছিল না এটাই তার নির্যাতনের শিকার হওয়ার প্রধান কারণ।
আসুন শুধু নারী নয়, পুরুষদের ক্ষেত্রেও দেখি মাদ্রাসা বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে শিশু নির্যাতনের ঘটনাও ঘটে, যেখানে লিঙ্গ নয় বরং ক্ষমতার অপব্যবহার ও অপরাধপ্রবণতাই মূল সমস্যা।
নিউরোসায়েন্স এখানে কোনো সমলিঙ্গ তত্ত্ব দিয়ে একে সরাসরি ব্যাখ্যা করে না। বরং এটি আচরণগত বিকৃতি, সুযোগের অপব্যবহার এবং ব্যক্তিগত নৈতিকতার ভাঙনের ফল হিসেবে দেখা হয়।
বাস্তবতায় ফিরে এলে দেখা যায় ক্ষমতার অপব্যবহার, নৈতিকতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অভাবই এমন জঘন্য অপরাধের মূল উৎস। এর সমাধানে প্রয়োজন ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা, পরিবারিক মূল্যবোধ, সামাজিক সচেতনতা এবং কার্যকর আইন প্রয়োগ।
পর্নোগ্রাফির ক্ষেত্রে গবেষণায় দেখা যায়, এর প্রভাব ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে এবং এটি সরাসরি ধর্ষণের কারণ হিসেবে বৈজ্ঞানিকভাবে নিশ্চিত নয়। তবে অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার কিছু মানুষের আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রণ ও শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।
সর্বশেষে, লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি নিরাপদ সমাজ তৈরি করা যেখানে নারী, পুরুষ ও শিশু কেউই নির্যাতনের শিকার না হন।
যাইহোক, ধর্ষণের মূল কারণ পোশাক নয়, বরং ব্যক্তির ক্ষমতার অপব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণের মানসিকতা যা ধর্মের যথাযথ গাইডেন্স ও কঠোর রাষ্ট্রীয় আইন কার্যকর ও বাস্তবায়নের মাধ্যমেই সম্ভব।
©দ্বীন সাঈদীন