পারমাণবিক বোমা ও তার বিশ্বকথন"

 "পারমাণবিক বোমা ও তার বিশ্বকথন"



পারমাণবিক শক্তি হলো এক প্রকার শক্তি যা পারমাণবিক সংযোজন বা বিভাজনের মাধ্যমে উৎপন্ন হয়। পারমাণবিক শক্তির নির্গমন তিনটি ধাপে সম্পন্ন হয়। প্রথমটি হলো পারমাণবিক শক্তির উদ্ভব, যা তেজস্ক্রিয় মৌলের ক্ষয় অথবা তেজস্ক্রিয় পদার্থের পরমাণুর নিউক্লিয়াসে অবস্থিত নিউট্রন ও প্রোটনের চলাচলের মাধ্যমে ঘটে। দ্বিতীয়টি হলো পারমাণবিক সংযোজনের মাধ্যমে পারমাণবিক শক্তির নির্গমন, যা দুটি পারমাণবিক নিউক্লিয়াসের সমন্বয়ে একটি বৃহত্তর নিউক্লিয়াস গঠনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। সর্বশেষটি হলো পারমাণবিক বিভাজনের মাধ্যমে পারমাণবিক শক্তির সৃষ্টি, যা ঘটে যখন একটি ভারী নিউক্লিয়াস দুই বা ততোধিক ছোট পারমাণবিক নিউক্লিয়াসে বিভক্ত হয়। যখন একটি ভারী পরমাণু নিউট্রন দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়, তখন এটি হালকা পরমাণুতে রূপান্তরিত হয় এবং তাপশক্তি নির্গত করে—এটিই পারমাণবিক শক্তি নামে পরিচিত। এই বিক্রিয়ার শুরুতে তিনটি নিউট্রন উৎপন্ন হয়।



'নিউট্রনের উৎপাদন এবং শৃঙ্খল বিক্রিয়া'



ধরা যাক, প্রতিটি পারমাণবিক বিক্রিয়া থেকে উৎপন্ন নিউট্রনের সংখ্যা = ৩।


একটি পারমাণবিক বিক্রিয়ায় তিনটি নিউট্রন উৎপন্ন হয়: ৩¹ = ৩


দুটি পারমাণবিক বিক্রিয়ায় নয়টি নিউট্রন উৎপন্ন হয়: ৩² = ৯


তিনটি পারমাণবিক বিক্রিয়ায় সাতাশটি নিউট্রন উৎপন্ন হয়: ৩³ = ২৭



ক্রমশ, নিউট্রনের সংখ্যা বাড়তে থাকে কারণ তারা পরবর্তী পারমাণবিক বিক্রিয়াগুলোতে অংশগ্রহণ করে, এবং অবশেষে একটি পারমাণবিক শৃঙ্খল বিক্রিয়া ব্যবস্থা গঠন করে। পারমাণবিক বিক্রিয়ার এই ধারাবাহিক প্রকৃতি এবং পারমাণবিক শক্তির অবিরাম উৎপাদন কখনোই ইতিবাচক ফল দিতে পারে না, যার প্রমাণ হিরোশিমা ও নাগাসাকির ঘটনা।



'হিরোশিমা ও নাগাসাকি: মানবিক ও পরিবেশগত প্রভাব'


যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা ব্যবহার করে। এর ফলে সেখানে গ্রাউন্ড জিরো তৈরি হয়, যা হলো সেই কেন্দ্রবিন্দু যেখানে বিস্ফোরণের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে। গ্রাউন্ড জিরোতে প্রচণ্ড তাপ, শকওয়েভ এবং তেজস্ক্রিয় বিকিরণ একসাথে কাজ করে। এর ফলে সেই এলাকার সবকিছু মুহূর্তের মধ্যে বাষ্পীভূত হয়ে যায় এবং সব ধরনের কাঠামো ও অবকাঠামোগত নির্মাণ ধ্বংস হয়ে পড়ে। এটি দেখায় পারমাণবিক বিস্ফোরণের ধ্বংসাত্মক শক্তি কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে।



বিস্ফোরণের পর তেজস্ক্রিয় বিকিরণ বা রেডিয়েশন এ জাপানে হিরোশিমায় লিটল বয় ও নাগাসাকিতে ফ্যাট ম্যান নিক্ষেপের কারণে প্রায় ২,১০,০০০ মানুষ মারা যায় যা মাসাও তোমনাগা নামে জাপানি চিকিৎসক ও গবেষক, এবং নাগাসাকি পারমাণবিক বোমা হামলার থেকে বাঁচা ভুক্তভোগী তাঁর লিখিত আর্টিকেল "The Atomic Bombings of Hiroshima and Nagasaki: A Summary of the Human Consequences, 1945-2018, and Lessons for Homo sapiens to End the Nuclear Weapon Age" এ তুলে ধরেন।



ভাবা যায়! পারমাণবিক বোমা হামলার পর থেকে জাপানের মানুষ দীর্ঘমেয়াদে রেডিয়েশন সিকনেস-জনিত সমস্যায় ভুগছে। বিস্ফোরণের কারণে অনেক শিশু জন্মগত ত্রুটি নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছে। মানুষের ইমিউন সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ফলে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেছে। এছাড়াও অনেক মানুষ ক্যান্সার, বিশেষ করে লিউকেমিয়া-তে আক্রান্ত হয়েছে।



শুধু কি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নাকি পরিবেশের উপর এর প্রভাব পড়েছে? জাপানে নিউক্লিয়ার উইন্টার হয়নি কারণ জাপানে দুটি পারমাণবিক বোমা ফেলা হয়েছিল ফলে রেডিয়েশন সিকনেস, জন্মগত ত্রুটি ও ইমিউন সিস্টেম ক্ষতি, এবং ঐ নগরগুলোর মাটির গুণাগুণ নষ্ট হয়েছিল ও পরিবেশ দূষিত হয়েছিল যা ঐ এলাকাগুলোর উৎপাদন ব্যবস্থা ও কৃষিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। কিন্তু নিউক্লিয়ার উইন্টার হয়নি কারণ অনেকগুলো পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটাতে হবে যাতে বায়ুমন্ডলের স্ট্রাটোস্ফিয়ারে পৌঁছানোর জন্য পর্যাপ্ত ধোঁয়া ও ধূলিকণা সৃষ্ট করতে হবে যা সূর্যের আলোকে পৃথিবীতে আসতে বাধা প্রদান করবে ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা হ্রাস পাবে আর এ অবস্থাকে নিউক্লিয়ার উইন্টার বলে।




'ইরান ও বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট'



বৈশ্বিক বর্তমান অবস্থার দিকে ফেরা যাক। বর্তমান বিশ্বে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলসহ পশ্চিমা দেশগুলো আশঙ্কা করে এটি ভবিষ্যতে অস্ত্র তৈরির দিকে যেতে পারে। এক্ষেত্রে ইসরায়েল মনে করে, ইরানের সম্ভাব্য পারমাণবিক সক্ষমতা তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে। এ হুমকিকে সামনে রেখে ২০২৫ ও ২০২৬ এ আমেরিকা ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধ হচ্ছে ফলে মধ্যপ্রাচ্য অস্থিতিশীল রয়েছে।



জাতিসংঘের একজন কর্মকর্তা দাবি জানালেন যে আমেরিকা ও ইসরায়েল পারমাণবিক বোমা ইরানে ফেলার প্রস্তুতি নিচ্ছে যা জাতিসংঘ সমর্থন করছে। এখন প্রশ্ন যদি জাপানের চেয়ে নিউক্লিয়ার উইন্টার ঘটনোর মতো পারমাণবিক বোমা ইরানে নিক্ষেপ করা হয় তাহলে পৃথিবী ও জলবায়ুর পরিবর্তন কেমন হবে?



স্ট্রাটোস্ফিয়ারে পৌঁছানো ধুলোকণা পৃথিবীতে সূর্যের আলো পোঁছতে বাধা দিবে ফলে স্বাভাবিকভাবে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা কমে যাবে। এর পরবর্তী কারণগুলো হবে অস্বাভাবিক শীতের তীব্রতা বাড়বে যা শুধু ইরান নয়, পুরো বিশ্বকে প্রভাবিত করবে।



সূর্যের আলো যদি পৃথিবীতে না পৌঁছায়, সালোকসংশ্লেষণ কিভাবে হবে যা প্রশ্ন? সালোকসংশ্লেষণের অভাবে শস্যের উৎপাদন কমে গেলে বিশ্বব্যাপী যদি দুর্ভিক্ষ ও খাদ্য সংকট দেখা দেয়, বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহ চেইন সিস্টেম হুমকির মুখে পড়বে।



'জলবায়ু, অর্থনীতি ও সামাজিক প্রভাব'




জলবায়ুর উপর পড়বে নেতিবাচক প্রভাব। বায়ুমণ্ডলে তেজস্ক্রিয় ধুলোর উপস্থিতি বাতাসে মৌলগুলোর যেমন অক্সিজেন, নাইট্রোজেন ও কার্বন ডাই অক্সাইডের ভারসাম্য নষ্ট করবে ফলে O₂ হ্রাস পাবে, অতিরিক্ত নাইট্রিক এসিড তৈরী হবে, বায়ুমন্ডলে এসিড বৃষ্টি বৃদ্ধি পেতে পারে। তাহলে কার্বন ডাই অক্সাইডের ভারসাম্য নষ্ট হলে গাছপালা ও সমুদ্র কার্বন শোষণের পরিমাণ কমিয়ে দিবে যা গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর কারণ হবে। একদিকে শীত ও অন্যদিকে তাপমাত্রা বৃদ্ধি বৈশ্বিক জলবায়ুকে হুমকির মুখে ফেলবে যা পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতিকে হুমকির মুখে ফেলবে ফলে বৈশ্বিক ইন্ডাস্ট্রি, প্রোডাকশন ও সাপ্লাই চেইন সিস্টেম বাধাগ্রস্ত হবে যা বিশ্বব্যাপী অস্থিরতা তৈরি করবে। বৈশ্বিক বাণিজ্যিক ও বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে ফলে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে বেকারত্ব ও দারিদ্র্য বাড়বে ফলে বৈশ্বিক সামাজিক কাঠামোয় ফাটল ধরবে যেমন ইনফ্লেশন বাড়বে, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য নাগালের বাইরে থাকবে, মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে।



'সম্ভাব্য রিফিউজি ক্রাইসিস এবং রাজনৈতিক জটিলতা'




যাইহোক, বৈশ্বিক রিফিউজি ক্রাইসিস তৈরি হবে। ইরানে পারমাণবিক বা বড় ধরনের হামলা হলে এর নাগরিক ও প্রভাবশালী পার্শ্ববর্তী দেশগুলো বিশেষ করে পাকিস্তান, আফগানিস্তান, তুরস্ক, ইরাক, সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে। তবে গালফ অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলো কি ইরানের নাগরিকদের আশ্রয় দিবে কারণ ইরান ইতিমধ্যে ঐ অঞ্চলগুলোতে মার্কিন ঘাঁটিকে কেন্দ্র করে ড্রোন ও ক্ষেপনাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।



অন্যদিকে ইইউ অধিভুক্ত দেশগুলো যেমন স্পেন, ইতালি ও সম্প্রীতি ফ্রান্স ও ইরান-আমেরিকা-ইসরায়েলের যুদ্ধে জড়াতে চাচ্ছে না, অন্যদিকে ন্যাটো কি ভেঙে যাবে, আমেরিকা কি বেরিয়ে আসবে ন্যাটো থেকে যা ভূরাজনৈতিক শক্তির নতুন মেরুকরণ তৈরি হবে। চীন ও রাশিয়া ইরান যুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করবে নাকি সীমিত সামরিক ও কৌশলগত সমর্থন দিয়ে যাবে। গালফ অঞ্চলের আরব দেশগুলো কি আমেরিকার অধীনস্থ থাকবে? সত্যিই কি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে রূপ নিবে বিশ্ব?


©দ্বীন সাঈদীন

Popular posts from this blog

Mental Sickness

E-learning

Imperialism VS Terrorism

At Sixes And Sevens

Bilateral Coherence and Dissonance Relationship between Western and Bangladeshi Culture

Mentalism:07

Shrewdness

Oppression upon Women Folks