পারমাণবিক একচেটিয়াবাদ
আবদুল কাদির খান ও পারমাণবিক একচেটিয়াবাদ
একজন আবদুল কাদির খান যিনি পশ্চিমা আধিপত্যবাদকে প্রশ্ন করার সাহস দেখিয়েছেন এবং এর বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে অবস্থান নিয়েছেন। তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী ও ধাতুবিদ্যা প্রকৌশলী (উইকিপিডিয়া, ২০২৬)। আবদুল কাদির খান পাকিস্তানের গ্যাস সেন্ট্রিফিউজভিত্তিক ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধিকরণ কর্মসূচির প্রতিষ্ঠাতা, যা দেশটির পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে (উইকিপিডিয়া, ২০২৬)।
এই পরমাণু বিজ্ঞানী পারমাণবিক শক্তির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ কয়েকটি শক্তিশালী দেশের হাতে সীমাবদ্ধ থাকুক এটি সমর্থন করতেন না। তার দৃষ্টিতে, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোরও আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে।
তবে তার কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিকভাবে তীব্র বিতর্কের জন্ম দেয়। অভিযোগ রয়েছে যে তিনি উত্তর কোরিয়া, ইরান এবং লিবিয়ার কাছে পারমাণবিক প্রযুক্তি সরবরাহে জড়িত ছিলেন। বিশেষ করে মুয়াম্মার গাদ্দাফির শাসনামলে লিবিয়া পরবর্তীতে এই কর্মসূচি ত্যাগ করে এবং তথ্য আন্তর্জাতিক মহলের কাছে প্রকাশিত হয়।
এই ঘটনাগুলো বিশ্ব রাজনীতিতে একটি বড় প্রশ্ন তুলে ধরে পারমাণবিক সক্ষমতা কি কেবল শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি সকল রাষ্ট্রের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে অন্যদিকে, অনেক বিশ্লেষকের মতে, মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম বিশ্বের কিছু রাষ্ট্র তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থে পশ্চিমা শক্তির সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। এর মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা, সামরিক ঘাঁটি স্থাপন এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে মার্কিন ডলারকেন্দ্রিক লেনদেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
পারমাণবিক অস্ত্র কেন কেবল কিছু শক্তিধর রাষ্ট্রের অধীনে সীমাবদ্ধ থাকবে কেন শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন অধিভুক্ত দেশগুলোই পারমাণবিক অস্ত্রের স্বত্বাধিকারী হবে এই প্রশ্ন আজও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গভীর বিতর্কের জন্ম দেয়।
পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ করা। কিন্তু বাস্তবে এই চুক্তি এমন একটি কাঠামো তৈরি করেছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, চীন এবং ফ্রান্সের মতো দেশগুলোকে স্বীকৃত পারমাণবিক শক্তি হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, অথচ ভারত, পাকিস্তান ও উত্তর কোরিয়ার মতো দেশগুলো একই মর্যাদা পায়নি।
এ অবস্থায় প্রশ্ন ওঠে এই চুক্তি কি সত্যিই ন্যায্যতার ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে, নাকি এটি একটি বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা, যা বিদ্যমান শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর আধিপত্যকে দীর্ঘায়িত করে এবং নতুন উদীয়মান শক্তিগুলোকে সীমাবদ্ধ রাখে বর্তমান বিশ্বরাজনীতিতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এই বিতর্ককে আরও তীব্র করে তুলেছে। ইরান যখন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, তখন যুক্তরাষ্ট্র তার ওপর বহুমুখী অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং ইসরায়েলের সাথে সমন্বয় করে চাপ প্রয়োগ করছে।
এই পরিস্থিতি অনেকের কাছে এমন বার্তা দেয় যে, পাকিস্তান ও উত্তর কোরিয়ার মতো রাষ্ট্রগুলোর পর আর কোনো নতুন শক্তি যেন পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন করতে না পারে বিশেষ করে যদি তা পশ্চিমা শক্তি ও তাদের মিত্রদের জন্য কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক চাপ, নিষেধাজ্ঞা এবং উত্তেজনা থেকে একটি বড় প্রশ্ন উঠে আসে পারমাণবিক প্রযুক্তি ও অস্ত্রের অধিকার কি বৈশ্বিকভাবে সমানভাবে বণ্টিত, নাকি এটি একটি নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা যেখানে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো নিজেদের প্রাধান্য বজায় রাখে
একজন আবদুল কাদির খান যিনি পশ্চিমা আধিপত্যবাদকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে মুসলিম হিসেবে নিজের মেরুদণ্ড সোজা রেখেছেন অথচ মুসলিম বিশ্ব আজ পশ্চিমা আধিপত্যবাদের পৃষ্ঠপোষক। বৈশ্বিক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক বাস্তবতায় মুসলিম বিশ্ব যদি পশ্চিমা আধিপত্যবাদের পৃষ্ঠপোষক না হয়ে প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়াতো তাহলে বৈশ্বিক কাঠামোর ভিত্তি একটি ভরকেন্দ্রে পুঞ্জীভূত হতো না।
©দ্বীন সাঈদীন