ইসলামী বিধান বনাম রাষ্ট্রীয় আইনের ফাঁক ও মুসলিমদের পশ্চিমা দাসত্ব সংস্কৃতি"
"ইসলামী বিধান বনাম রাষ্ট্রীয় আইনের ফাঁক ও মুসলিমদের পশ্চিমা দাসত্ব সংস্কৃতি"
ইরানের মাশা আমানির কথা হয়তো অনেকের মনে আছে। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে ঘটা ঘটনাটি পুরো বিশ্বে আলোড়ন তুলেছিল। আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির সময় এ ঘটনা ঘটেছিল। ইরানে নারীদের কপাল ও শরীরের অংশ ঢেকে রাখা বাধ্যতামূলক; কিন্তু মেয়েটি তা করেনি, এবং পুলিশ তাকে "হিজাব শিক্ষা ক্লাস"-এর কথা বলে গ্রেফতার করে মারধর করে। পরবর্তীতে সে মৃত্যুবরণ করে।
ইসলাম কি বলে–বাধ্যতামূলকভাবে কি কাউকে ধর্মের দিকে আকৃষ্ট করা যায়?
পবিত্র কুরআন কি বলে? আসুন দেখি।
সূরা বাকারার ২:২৫৬ আয়াতে বলা হয়েছে:
"ধর্মে কোনো জোর বা বাধ্যবাধকতা নেই; সত্যতা স্পষ্টভাবে মিথ্যা থেকে আলাদা। যে বিশ্বাস করে এবং ন্যায়পথে চলে, সে সঠিক পথে আছে।"
ধর্মে কোনো জোর বা বাধ্যবাধকতা নেই।
ইসলামের মূলনীতি বলছে বাধ্যবাধকতা নেই; কিন্তু ইরানের রাষ্ট্রীয় আইন অনুযায়ী নারীদের হিজাব বাধ্যতামূলক। এখানেই স্পষ্ট–পুরুষতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় ইসলামের মূলনীতি অবহেলিত।
আসুন দেখি সূরা কাহফের ১৮:২৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ তায়ালা কি বলেছেন:
"বলুন, 'সত্য আসে আল্লাহর পক্ষ থেকে। যে কেউ চায়, সে বিশ্বাস করুক; আর যে চায়, সে অমান্য করুক।' আমরা মানুষের জন্য তাদের কাজগুলো সাজাই।"
সত্য যদি মাশা আমানির নিকট আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক না আসে, তাহলে কি রাষ্ট্রীয় আইন তা জোর করে প্রয়োগ করতে পারবে?
আসুন সূরা জুমা ৬২:৮ আয়াতে মহান আল্লাহ তায়ালা কি বলেছেন:
"আল্লাহ প্রত্যেককে তার নিজের পথ অনুসরণ করতে দিয়েছেন। সুতরাং, যারা পাপ করে, তারা কেবল নিজেদেরই ক্ষতি করে।"
আল্লাহ তায়ালা মানুষকে স্বাধীন ইচ্ছে দিয়েছেন। মাশা আমানি হয়তো সেই সুযোগ পাননি; বরং রাষ্ট্রীয় আইন তার ওপর প্রয়োগ করে তাকে মৃত্যুর দিকে ধাবিত করেছে এবং তার বেঁচে থাকার অধিকারকে সীমিত করেছে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালার চেয়ে ইরানের রাষ্ট্রীয় আইন বেশি সদয় হতে পারে না।
আসুন দেখি, কুরআন নারী ও পুরুষ উভয়ের সম্পর্কে কি বলে।
পুরুষদের সম্পর্কে বলা হয়েছে:
"ওহে বিশ্বাসীরা! তোমরা তোমাদের দৃষ্টি নিচু কর এবং তোমাদের লজ্জাস্থান রক্ষা কর; এটি তোমাদের জন্য অধিকতর পবিত্র ও উত্তম।" –সূরা নূর ২৪:৩০
নারীদের সম্পর্কে বলা হয়েছে:
"
এবং তোমরা তোমাদের দৃষ্টি নিচু কর এবং তোমাদের লজ্জাস্থান রক্ষা কর; এবং তোমাদের সৌন্দর্য প্রকাশ কেবল তোমাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, ভাই, বা স্বামীর পরিবারসহ আত্মীয়দের জন্য সীমিত রাখ; বাইরে অন্য কারো জন্য প্রকাশ করো না। তোমরা তোমাদের শাড়ি প্রায় শিরোদগা পর্যন্ত ঢেকে রাখো।"– সূরা নূর ২৪:৩১
পবিত্র কুরআনে স্পষ্টভাবে নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য বিধান দেওয়া হয়েছে–একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। তাহলে সমস্যা আসলে কোথায়? এই প্রশ্ন হয়তো পুরো মুসলিম দেশগুলোর বাস্তব সমস্যাগুলো আয়নায় প্রতিবিম্বের মতো তুলে ধরে।
আসুন সেই প্রতিবিম্বের দিকে অগ্রসর হই।
প্রথমত, পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোয় নারীকে বন্দি করার চেষ্টা।
দ্বিতীয়ত, পুরুষদের অবাধ স্বাধীনতার দ্বার উন্মোচিত করা।
তৃতীয়ত, নারীদের স্টেরিওটাইপ ও মাইনরিটি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা।
আসুন তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ বাদ দিয়ে বাস্তবতায় যাই।
সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, বাহরাইনের মতো দেশে কেন বার, ক্লাব, বেলি ড্যান্সের মতো পশ্চিমা সংস্কৃতি ইসলামীয় সংস্কৃতিতে প্রতিস্থাপিত হচ্ছে? তাহলে কি সূরা নূর ২৪:৩০ আয়াত, যা পুরুষদের জন্য আরোপিত, তা লঙ্ঘিত হচ্ছে না? একইভাবে সূরা নূর ২৪:৩১, যা নারীদের ওপর আরোপিত, তা কি লঙ্ঘিত হচ্ছে না?
নারীদের ওপর যখন রাষ্ট্রীয় আইন দিয়ে পর্দা প্রথা বাধ্যতামূলক করা হয়, তখন ক্লাব-বার সংস্কৃতি বা আরব দেশগুলোতে পর্নোগ্রাফি ও পতিতাবৃত্তির প্রসার কেন? এসব কর্মকাণ্ডে কি শুধু নারীরা জড়িত, পুরুষরা নয়?
গালফ অঞ্চলের আরব দেশগুলোর রাজতান্ত্রিক কাঠামোয় শাসকদের বাস্তব জীবন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়–তাদের বিলাসিতার পেছনে আল্লাহ তায়ালার বিধান ও তাদের রচিত রাষ্ট্রীয় আইনের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।
ইসলামে ধর্ম জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া হয়নি; বরং রাষ্ট্রীয় আইনের সীমাবদ্ধ কাঠামোর কারণে ইসলামের সৌন্দর্য অনেক সময় প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এতে অমুসলিমরা, বিশেষত যারা ইসলামের বিরোধী, তারা সুযোগ পায় মুসলিমদের গৌরবকে খাটো করার। ফলে নামধারী মুসলিম বিশ্ব অনেক ক্ষেত্রে পশ্চিমাদের সাংস্কৃতিক প্রভাবের কাছে আত্মসমর্পণ করে।
© দ্বীন সাঈদীন