মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও রাজতন্ত্রের জটিল সম্পর্ক
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও রাজতন্ত্রের জটিল সম্পর্ক
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোই যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব এবং ভীতকে শক্ত করেছে। যদি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক ঘাঁটি দেওয়ার অনুমোদন না দিত, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে এতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারত না। কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কুয়েতের শাসন কাঠামো রাজতন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল। রাজতান্ত্রিক কাঠামো টিকিয়ে রাখতে এবং নিজেদের আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য তারা যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের অনুমোদন দিয়েছে। এই ঘাঁটিগুলো থেকে যুক্তরাষ্ট্র সহজে সেনা মোতায়ন, পরিচালনা করতে পারে, গোয়েন্দা নজরদারি চালাতে পারে এবং আঞ্চলিক সংঘাতে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম।
কেন ইরান কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে? এর উদ্দেশ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের উপর সামরিক অভিযান চালানো এবং নজরদারি করা কঠিন করে তোলা। এই হামলার মাধ্যমে ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে বার্তা দেয় যে, আঘাত হানলে পাল্টা প্রতিরোধে সক্ষম। ইরান এই ধরনের দাঁত ভাঙা জবাব দিয়ে তার প্রতিরোধশক্তি প্রদর্শন করছে।
ইরানের মিত্র গোষ্ঠীগুলো যেমন ইরাক, ইয়েমেন ও লেবাননের শিয়া মিলিশিয়া, হুথি গোষ্ঠী এবং হিজবুল্লাহ ইরানের পক্ষ নিয়ে আঞ্চলিক প্রতিরোধে অংশ নিচ্ছে। বিশেষ করে ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী ইতিমধ্যেই ইরানের পক্ষ নিয়ে প্রতিরোধের অংশীদার হয়েছে।
প্রশ্ন আসে, কেন কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরব নীরব দর্শক হয় যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে আক্রমণ চালায়। এর প্রধান কারণ হলো তাদের রাজতন্ত্রের রক্ষা, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অর্থনৈতিক ও সামরিক নির্ভরতা, এবং বৈশ্বিক তেলের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান। মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা দেখা দিলেই যুক্তরাষ্ট্র প্রভাবশালী হয়ে ওঠে, যা তাদের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্র কেন ইসরায়েলকে সমর্থন দেয়? যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র এবং সামরিক প্রযুক্তির বাজার দীর্ঘায়িত করতে। মধ্যপ্রাচ্যে যত বেশি যুদ্ধ এবং সংঘাত হবে, মার্কিন অর্থনীতি তত বেশি চাঙা হবে। বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, গোলাবর্ষণ, ক্ষেপণাস্ত্র, ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং ড্রোন প্রযুক্তির বাজার সম্প্রসারণই এর পেছনের মূল উদ্দেশ্য। এছাড়া, জায়োনিস্ট বিলিয়নিয়ার যারা মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অর্থ যোগান দেয়, তারা নিশ্চিত করে যে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ইসরায়েলের বৈশ্বিক লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করবে। এর একটি প্রমাণ হলো ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। তারা দ্বিতীয়বারের মতো ইরানে হামলা চালিয়ে ঐতিহাসিক রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রতিফলন ঘটিয়েছে।
যদিও মধ্যপ্রাচ্যের রাজতন্ত্রগুলো ইরানের মার্কিন ঘাঁটিতে আক্রমণের পর আকাশসীমা বন্ধ করছে, তারা একই সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের দেশের আকাশসীমা ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছে। এর কারণ সবারই জানা: তাদের স্বার্থ এবং মার্কিন সহযোগিতা বজায় রাখা।
ইরান বশ্যতা স্বীকার করেনি, তবে রাজতান্ত্রিক মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো হয়েছে মার্কিন প্রভাবের অধীনে। তাই তারা সক্রিয়ভাবে হস্তক্ষেপ করে না, বিশেষ করে যখন ইরান মার্কিন ও ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও মিসাইল হামলার মুখোমুখি হয়।
ইরান তার পারমাণবিক অস্ত্র, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং জাতীয় স্বাতন্ত্র্য থেকে পিছিয়ে আসবে না, যতই অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক এবং সামরিক নিষেধাজ্ঞা চাপানো হোক। এটি একটি মুসলিম দেশ যা দশকের পর দশক ধরে মাথা উঁচু করে আমেরিকার সঙ্গে প্রতিরোধ করেছে। যদিও তার আশেপাশের কিছু দেশ মার্কিন প্রভাবের অধীনে রয়েছে, ইরান তার স্থিতিশীলতা এবং মর্যাদা বজায় রাখবে।ইনশাআল্লাহ।