লিঙ্গ বৈষম্য ও বিশ্বাসের স্বাধীনতা বনাম ইসলাম
লিঙ্গবৈষম্য ও বিশ্বাসের স্বাধীনতা: ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে
সমাজে স্তরভেদে মতামত ভিন্ন হবে। যেটা গ্রহণযোগ্য সেটা গ্রহণ করা উচিত। সব মতামত তো গ্রহণযোগ্য হবে না, তাই বলে কাউকে ব্যক্তিগত আক্রমণের পক্ষপাদী না হওয়া অন্যের মতামত ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রতি সম্মানকে অক্ষুণ্ন রাখে।
লিঙ্গবৈষম্য একটি সোসাইটি সৃষ্টি বৈষম্যমূলক অবস্থার একটি রূপ।
আপনি পবিত্র কুরআনের আয়াতগুলো পড়েন যেখানে বলা হয়েছে "নারী পুরুষ একে অপরের পরিপূরক।" (সূরা বাকারা, আয়াত: ২:১৮৭) তাহলে সমাজে লিঙ্গবৈষম্যের প্রশ্ন উঠে কেন?
একজন অধ্যাপিকা তাঁর মতামতের জন্য কেন সমাজের দ্বারা প্রশ্নবিদ্ধ হবে? হে, তাঁর দায়িত্বের সহিত সংযতভাবে বিষয়টি তুলে ধরা।
আর যারা তাঁকে আক্রমণ করছেন নারী হবার জন্য, তাঁরা কি এই আয়াত পড়েছেন যে পবিত্র কুরআনের সূরা আত-তাওবা বলা হয়েছে, "মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী একে অপরের বন্ধু (অভিভাবক/সহযোগী)।" ---সূরা আত-তাওবা, আয়াত ৯:৭১
যারা আমাদের মা, বোনদের একপাক্ষিক সৃষ্ট বৈষম্যমূলক লেন্স দিয়ে তাঁদের বিচার করেন, এটা তাদের ইসলাম সম্পর্কে জানার অভাব থেকে করে হয়তো সচেতনভাবে বা অবচেতনভাবে একপাক্ষিক পুরুষতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য।
যারা এমন নারী বিদ্বেষ দেখান, তাঁরা তাদের জীবন থেকে নারী বয়কট করে কি ইবনে সিনা, ইবনে হাইয়ান বা রাবেয়া বসরীর মতো আল্লাহ তায়ালা কেন্দ্রিক জীবন বেছে নেওয়ার সক্ষমতা রাখেন?
আল্লাহ তায়ালা সবাইকে বিবেক ও বিবেচনাবোধ দিয়েছেন, তাতে স্বাধীনতা দিয়েছেন।
ইসলামে আছে, "ধর্মে কোনো জবর নেই; সত্য স্পষ্ট হয়ে গেছে। যে বিশ্বাস করে, এবং যে বিশ্বাস করে না, তাদের মধ্যে কাউকেই জবর করা যায় না।"--সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২:২৫৬
যেখানে আল্লাহ তায়ালা মানুষকে বিশ্বাস ও মানসিক স্বাধীনতা বেছে নেয়ার স্বাধীনতা দিয়েছেন, আমরা কে একজন নারী বা একজন পুরুষ বা তৃতীয় লিঙ্গের একজন মানুষের ধর্মীয়, বিশ্বাস, সিদ্ধান্তে প্রশ্ন তোলার?
পবিত্র কুরআনের সূরা আশ-শূরা (৪২:৫৩) তে বলা হয়েছে, "এই কোরআন হল পরামর্শ, যাতে তারা চিন্তা করে এবং যারা বিবেকশীল তারা শিক্ষা গ্রহণ করে।"
কুরআনেও "বিবেকশীল" কথার উপর জোর প্রদান করা হয়েছে। যারা সত্যের কাছে আসতে চান, তাঁরা চিন্তা করেন।
আমরা সমাজে কেন একজন পুরুষ বা নারীকে বা তৃতীয় লিঙ্গের কোনো মানুষকে আক্রমণ করব, যেখানে স্রষ্টা মানুষকে বিশ্বাস ও মানসিক স্বাধীনতা বেছে নেয়ার স্বাধীনতা দিয়েছেন (সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২:২৫৬)?
ইসলাম কি পুরুষ বা নারীতে কোনো বিভাজন দেখিয়েছে? কেন আয়াতগুলোতে বারবার পরিপূরক কথা উঠে আসে? ইসলাম সমতার ভারসাম্যে বিশ্বাস করে। যারা আক্রমণ করেন, নারীদের প্রান্তিক করে রাখতে চান, তারা কোথা থেকে দৈব বাণী পেয়েছেন, জানাবেন?
একইভাবে নারী সমাজের একাংশের হাতে পুরুষ নির্যাতনের ঘটনা ঘটে, তা তারা কোথা থেকে এমন আচরণ আয়ত্ত করলেন?
তৃতীয় লিঙ্গ কোনো অভিশাপ নয়, জন্মগত ত্রুটি। তাঁদের XXY বা XO ক্রোমোজম ও অ্যান্ড্রোজেন হরমোনাল ইস্যুর কারণে তাঁদের আচরণে ও মানসিকতায় পরিবর্তন আসে। সমাজের কজন মানুষ ইসলাম ও বায়োলজির নলেজ রাখেন?
যদি মানুষ লিঙ্গ বৈষম্য, নারী ও পুরুষের সমানাধিকার, মাইনরিটি বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী (তৃতীয় লিঙ্গ) ও তাদের অধিকার, সাম্য ও সমতা এসব সমাজসৃষ্ট বিষয় নিয়ে পড়াশোনা না করতো, তবে এসব বিষয় উচ্চতর শিক্ষার ডোমেইন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হতো না। প্রকৃত জ্ঞান উৎপাদনের ক্ষেত্রে সমাজসৃষ্ট বিষয়গুলো কখনো প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের ডোমেইন হতে পারে না।
রিসার্চ পেপারে একাডেমিও ক্লান্ত এসব লিঙ্গ বৈষম্য, নারী ও পুরুষের সমানাধিকার, মাইনরিটি বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উপর পেপার স্টোরেজে। পুরো বৈশ্বিক সোশ্যাল সায়েন্সের কাঠামোয় এসব ডোমেইন নিয়ে রিসার্চ হচ্ছে। বৈশ্বিক সমাজকাঠামো এসব ডোমেইন নিয়ে চর্চা করিয়ে বিশ্বকে ভুল বার্তা দিচ্ছে। লিঙ্গগত বৈষম্য এবং প্রান্তিক গোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে যেসব হিউম্যান রাইটস অর্গানাইজেশন গড়ে উঠেছে, আন্তর্জাতিক ও দেশীয় আইন ও আদালত তৈরি হয়েছে। এই পুরো চেইন সিস্টেমে ইসলাম ও বায়োলজির জ্ঞানের উপেক্ষার সমন্বিত ফল।
একজন মুসলিম হিসেবে আমি বলতে পারি না যে আমার বোন কেন হিজাব পড়েনি বা ওড়না পরিধান করে নি। বা একজন মুসলিম হিসেবে আমার রাইট নেই বলার যে ভাইটি কেন দাড়ি রাখেনি। কারণ ইসলাম আমাকে সে অধিকার দেয় নি, তা বলার যা সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২:২৫৬ আয়াতে স্পষ্ট বলা আছে। স্রষ্টা যেখানে ফ্রি উইল এর স্বাধীনতা দিয়েছেন, আমি কে বা সমাজ কে বাধ্য করার আমার মুসলিম বা অমুসলিম ভাই বা বোনের ব্যক্তিস্বাধীনতা নিয়ে কথা বলার?
সূরা নূরের আয়াত ৩০ ও আয়াত ৩১ এ নারী ও পুরুষ উভয়েরই দৃষ্টি সংযত রাখার কথা বলা হয়েছে।
সূরা নূরের আয়াত ৩০:
"আর যারা পুরুষ, আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী, তারা তাদের দৃষ্টি নিচে নামাক..."
আয়াত ৩১:
"আর যারা নারী, আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী, তারা তাদের দৃষ্টি সংযত করুক..."
অথচ আমরা সমাজে কি করছি? আমরা আমাদের ভাইবোনদের দিকে কুমন্তব্য করছি। আপনি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টের কমেন্টগুলোর উপর ছোট একটা রিসার্চ করেন, দেখতে পাবেন আমরা আমাদের চোখ ও ব্রেনকে ব্যবহার করে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ, আক্রমণ করছি আমাদের ভাইবোনদের কেন? ইসলাম কি তা বলে?
সোশ্যাল মিডিয়া কালচারাল প্যাটার্নটাই এমন। কেন এত সস্তা ও রুচিহীন কনটেন্ট ক্রিয়েটর কারা তৈরি করছে? মেটা বা মার্ক জাকারবার্গকে কে লাভবান করছে? উত্তর: আমরাই।
মানুষ যদি সত্যি ইসলামিক আদর্শ ধারণ করতেন, তাহলে বৈশ্বিক এনাটমির প্যাটার্নটার দুই পঞ্চমাংশ ইসলামিক প্যাটার্নে ফাংশন করত।
© দ্বীন সাঈদীন।